রাবিতে ১৬ মাসেও জমা হয়নি সত্যানুসন্ধান প্রতিবেদন


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ২০০৯ সাল থেকে সংঘটিত থেকে দুর্নীতি-অনিয়ম এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানকালে নির্যাতন-হয়রানির অভিযোগ অনুসন্ধানে গঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্যানুসন্ধান কমিটি ১৬ মাসেও প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। এতে কমিটির কার্যক্রম ও প্রতিবেদন প্রকাশ নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

গত বছরের ১৫ এপ্রিল সিন্ডিকেটের ৫৩৮তম সভায় তৎকালীন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনকে সভাপতি করে ১৬ সদস্যের সত্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অনিয়ম-দুর্নীতি, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম এবং জুলাই অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক নির্যাতন-হয়রানির অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দেওয়ার দায়িত্ব ছিল কমিটির। তবে এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিবেদন জমা পড়েনি।

কমিটি সাতটি ইস্যুতে দুই দফায় অভিযোগ ও তথ্য সংগ্রহ করে। পরে অভিযোগগুলো তদন্তে পাঁচটি উপকমিটি গঠন করা হয়। এসব উপকমিটিকে ২০২৪ সালের বিপ্লববিরোধী অবস্থানসংক্রান্ত ১২টি, অ্যাকাডেমিক অনিয়মের ৩২টি, হলসংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির চারটি, যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন ও হয়রানির ১২টি এবং আর্থিক অনিয়মের নয়টি অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এদিকে, সামনে অনুষ্ঠেয় ডিন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কমিটির কার্যক্রম নিয়ে ভিন্ন ধরনের হিসাব-নিকাশ চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের ভোটের সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে অভিযুক্ত আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সত্যানুসন্ধান কমিটি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, “কমিটি গঠনের সময় মনে হয়েছিল দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলোর একটি নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হবে। কিন্তু, ১৬ মাসেও প্রতিবেদন জমা না হওয়া খুবই অস্বাভাবিক বিষয়। ২০০৯ সাল থেকে দীর্ঘ সময়ের দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ এবং জুলাই অভ্যুত্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ের নির্যাতন-হয়রানি, যৌন হয়রানির মতো অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের দায়িত্ব পাওয়া কমিটির প্রতিবেদন দ্রুত প্রকাশ করা জরুরি।”

তবে, উপ-কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্যরা বলছেন, এমন অভিযোগ সঠিক নয়। প্রশাসন পরিবর্তন হওয়ায় কমিটিগুলোর কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বর্তমান প্রশাসন চাইলে আবার কার্যক্রম শুরু করে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব।

যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন ও হয়রানিসংক্রান্ত উপ-কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক বেলাল হোসেনকে কল করলে তিনি সাড়া দেননি। একই উপকমিটির সদস্য ও সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম বলেন, “ছাত্র উপদেষ্টা হিসেবে আমার নামটা কমিটিতে ছিল।অনেকগুলো অভিযোগ জমা হয়েছিল, সেগুলো আমরা মোটামুটি যাচাই-বাছাই করেছিলাম। উভয় পক্ষের সাথে কথা বলে আমরা মোটামুটি সুরাহা করার করার চেষ্টা করেছিলাম। তারপরে কী হয়েছে জানি না। ওই কমিটি কী অবস্থায় আছে বা সর্বশেষ খবর আর আমার কাছে কোনো আপডেট নেই। দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছি।”

ডিন নির্বাচনে ভোট টানতে কমিটিগুলোর স্থবিরতার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, “অভিযোগের বিষয়ে তো আমি কিছু বলতে পারব না। কারণ আমাদের পরীক্ষা কমিটির কাজ থাকে, অ্যাকাডেমিক কাজ থাকে, রেজাল্ট দেওয়ার কাজ থাকে। আরো বিভিন্ন জটিলতায় অনেক সময় ব্যয় হয়। এছাড়া, বিষয়টা নিয়ে পূর্বে মামলা হলে, লিগ্যাল সেলেরও বিষয় থাকে। সবমিলিয়ে দেরি হয়।”

একই উপকমিটির সদস্য সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক জামিরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কয়েকটি মিটিং ডাকা হলেও পরে আর কোনো কার্যক্রম হয়নি। প্রতিবেদনও দেওয়া হয়নি। সাধারণত যারা আহ্বায়ক কমিটিতে থাকেন, তারা সভা ডাকলেই কার্যক্রম এগোয়।”

সামনে ডিন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কমিটির কার্যক্রম স্থবির রাখার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “বিভিন্ন ধরনের ক্যালকুলেশন থাকে, এ বিষয়ে আমি কী বলব? তবে, এমন অভিযোগের সত্যতা আছে বলে মনে হয় না।”

অ্যাকাডেমিক অনিয়মসংক্রান্ত (নিয়োগ, শিক্ষকদের দুর্নীতি ও অন্যান্য অনিয়ম) উপ-কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ বেলাল হোসেন বলেন, “ওই কমিটি পরিবর্তন হয়ে গেছে। যখন নতুন প্রশাসন এসেছে ওই কার্যক্রমটা স্থগিত হয়ে গিয়েছে। গত সিন্ডিকেটে নতুন করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটিতে আমাকে রেখেছে। কিন্তু, উপ-কমিটি হয়েছে কি না সেই বিষয়ে বলতে পারছি না।”

২০২৪ সালে সংঘটিত বিপ্লববিরোধী অবস্থানসংক্রান্ত উপকমিটির আহ্বায়ক এগ্রোনমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমরা কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম। এরপর প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেভাবে আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিবেদনটি অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় রয়েছে। বিষয়টি মূলত প্রশাসনের উদ্যোগের ওপর নির্ভর করছে। বর্তমান উপাচার্য এ বিষয়ে কীভাবে উদ্যোগ নেবেন, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেশ কয়েকটি কমিটি কাজ করেছে এবং বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছে। এসব রিপোর্টে বেশ কিছু ভয়াবহ চিত্রও উঠে এসেছিল। এখন প্রশাসন যদি উদ্যোগ নেয়, তাহলে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এসব বিষয় পূর্ণাঙ্গভাবে সাজিয়ে একটি রিপোর্ট আকারে প্রকাশ করা সম্ভব।”

হলসংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতি উপ-কমিটির আহ্বায়ক ও ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন অধ্যাপক খন্দকার মো. মোজাফফর হোসেন বলেন, “ওটা আপাতত স্থগিত আছে। আমাদের আর হয়তো দু-একটা মিটিং করা লাগবে। প্রশাসনের সাথে কথা বলে আমরা ফাইনাল করে দেবো। ওই ব্যাপারে প্রসিড করব কি না এ নিয়ে এখনও নতুন প্রশাসনের সাথে আমরা কথা বলতে পারিনি। নতুন প্রশাসনের সাথে কথা বলে যদি তারা বলেন–আপনারা মিটিং সেটিং করেন, প্রসিড করেন, তাহলে সেভাবে আমরা আগাব।”

সত্যানুসন্ধান কমিটির সভাপতি সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে রাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “ফ্যাসিবাদ আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। এছাড়া, জুলাই অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক নির্যাতন-হয়রানির ঘটনাগুলো তদন্ত কমিটির মাধ্যমে উঠে আসা জরুরি।

সত্যানুসন্ধান কমিটির কার্যক্রম নিয়ে আমরা হতাশ হচ্ছি। ১৬ মাস ধরে একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ঝুলে থাকা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। তদন্তের নামে কোনো ধরনের গড়িমসি বা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ থাকলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।”

“অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগের সত্যতা না থাকলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসমাজের স্বার্থে কমিটির কার্যক্রম, তদন্তের অগ্রগতি এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আনা উচিত। প্রশাসন ও কমিটির সদস্যদের উচিত যতদ্রুত সম্ভব প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থা করা”, যোগ করেন তিনি।

ডিন নির্বাচনে ভোট টানতে কমিটিগুলোর স্থবিরতার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলিম বলেন, “যারা ১৬ মাস সময় নিয়েছে, সেই জবাব তাদের দিতে হবে। আমি তো ওখানে ছিলাম না। তারা কেন ১৬ মাস নিয়েছে, এটার জবাব তো আর আমি দিতে পারব না।”

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, “আমরা কমিটি পুনর্গঠন করছি। কিছু কিছু কমিটিতে পূর্বের প্রশাসনের দুই উপ-উপাচার্য দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু, তারা তো আর নাই। এজন্য কমিটি পুনর্গঠন করার প্রয়োজন হয়েছে। আমরা চেঞ্জ করছি। তারপর কমিটি পুনর্গঠন হয়ে গেলে কমিটিগুলো আবার কাজ শুরু করবেন এবং যথারীতি প্রতিবেদন প্রকাশও সম্ভব হবে বলে আশা রাখছি।”





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *