ভয়াবহ খবর দেখলে মনের ওপর কতটা চাপ ফেলে জানেন?


রংপুরের হত্যাকাণ্ড, নেপালের ভয়াবহ ভূমিধস, প্রাণহানির খবর কিংবা যুদ্ধ ও সংঘাতের মতো সাম্প্রতিক সময়ে এমন নানা ভয়াবহ ঘটনার ছবি ও ভিডিও খুব সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে আমাদের মোবাইলের পর্দায়। শুধু সংবাদমাধ্যম নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতাতেও একই দৃশ্য বারবার সামনে আসছে।

একটি ভিডিও শেষ হতে না হতেই আরেকটি, তারপর আরও একটি। দেখতে না চাইলেও অ্যালগরিদমের কারণে চোখের সামনে ভেসে উঠছে ধ্বংস, মৃত্যু, কান্না আর আতঙ্কের ছবি।

কয়েকদিন পর হয়তো ঘটনার তীব্রতা কিছুটা কমে আসে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় তার রেশ থেকে যায়। ফলে আমরা বারবার একই ধরনের কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছি। বাইরে থেকে সব স্বাভাবিক মনে হলেও এর প্রভাব যে মনের ওপর পড়ছে না, তা কিন্তু নয়।

অনেকেই ভাবেন, ‘আমি তো খাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি, কাজ করছি-আমার আবার কী হয়েছে?’ কিন্তু দিনের পর দিন ভয়াবহ ঘটনা নিয়ে তৈরি ছবি, ভিডিও ও খবর দেখতে থাকলে মস্তিষ্কের ওপর তৈরি হতে পারে অতিরিক্ত চাপ। কখনো সেই প্রভাব বোঝাও যায় না সঙ্গে সঙ্গে।

খবর দেখতে দেখতে কখন ডুমস্ক্রোলিং?

অফিস থেকে ফেরার পথে মোবাইলে রিল দেখতে শুরু করেছেন। একটি ভয়াবহ ঘটনার ভিডিও দেখলেন। তারপর তার আপডেট খুঁজলেন। এরপর আরেকটি ভিডিও, আরও একটি বিশ্লেষণ-এভাবে কখন যে দীর্ঘ সময় কেটে গেল, খেয়ালই করলেন না।

রাতে ঘুমানোর আগে একই কাজ করছেন? বারবার দুর্যোগ, হত্যাকাণ্ড, যুদ্ধ কিংবা সংঘাতের নতুন খবর খুঁজছেন? তাহলে আপনি ডুমস্ক্রোলিংয়ের অভ্যাসে আটকে যেতে পারেন।

এই অভ্যাসের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ভয়াবহ কনটেন্ট দেখার পরও মস্তিষ্ক থামতে চায় না। বরং নতুন তথ্য জানার তাগিদে মানুষ আরও দেখতে থাকে। ফলে মানসিক অস্বস্তির একটি চক্র তৈরি হতে পারে।

মস্তিষ্কে যে প্রভাব পড়ে

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের মতে, এ ধরনের ভয়াবহ কনটেন্ট বারবার দেখার ফলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে অ্যামিগডালা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। ভয় ও বিপদের অনুভূতির সঙ্গে অ্যামিগডালার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স ও হাইপোথ্যালামাসের কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে। ফলে মস্তিষ্ক সব সময় যেন সম্ভাব্য বিপদের জন্য প্রস্তুত থাকতে শুরু করে।

এ সময় শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের ক্ষরণও বাড়তে পারে। কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে গেলে মানসিক চাপ, অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠা বাড়ার পাশাপাশি হৃদস্পন্দনও বেড়ে যেতে পারে।

সামান্য ঘটনাতেও ভয় লাগে

ভয়াবহ ঘটনা দেখতে দেখতে মস্তিষ্কের বিপদ শনাক্ত করার ব্যবস্থা যেন অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে। ফলে আগে যে বিষয়গুলোকে স্বাভাবিকভাবে নিতেন, সেগুলোতেও হঠাৎ ভয় বা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।

চামচ বা গ্লাস পড়ে যাওয়ার শব্দে চমকে ওঠা, হঠাৎ অস্থির হয়ে যাওয়া কিংবা ছোটখাটো ঘটনায় অতিরিক্ত ঘাবড়ে যাওয়ার মতো প্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ঘুমের সমস্যা। রাতে ঘুম আসতে দেরি হওয়া, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া কিংবা ভয়াবহ ঘটনার দৃশ্য স্বপ্নে ফিরে আসার মতো অভিজ্ঞতাও হতে পারে।

নেতিবাচক চিন্তার চক্র

ভয়াবহ খবর নিয়মিত দেখতে থাকলে মানুষের মনে নেতিবাচকতার প্রভাব আরও শক্তিশালী হতে পারে। সামান্য খারাপ ঘটনাও তখন অনেক বড় ও ভয়াবহ বলে মনে হতে পারে।

একসময় মনে হতে পারে, পৃথিবীজুড়েই শুধু খারাপ ঘটনা ঘটছে। ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হতে পারে হতাশা ও অনিশ্চয়তা। এর প্রভাব পড়তে পারে দৈনন্দিন মন-মেজাজ, কাজের আগ্রহ এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ওপরও।

অন্যের বিপর্যয়েও তৈরি হতে পারে ট্রমা

ভয়াবহ কোনো ঘটনা নিজে প্রত্যক্ষ না করেও তার ছবি বা ভিডিও বারবার দেখলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। মনোবিজ্ঞানে একে ভাইকারিয়াস ট্রমাটাইজেশন বা সেকেন্ডারি ট্রমার সঙ্গে সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা হয়।

কারো ক্ষেত্রে রাতে দুঃস্বপ্ন দেখা বা হঠাৎ ভয়াবহ দৃশ্য মনে পড়ে যাওয়ার মতো প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। আবার কেউ অতিরিক্ত ভয়, উৎকণ্ঠা কিংবা অস্থিরতায় ভুগতে পারেন।

তবে সবার প্রতিক্রিয়া এক নয়। কেউ ধীরে ধীরে ওই ধরনের দৃশ্যের প্রতি আবেগহীন হয়ে পড়তে পারেন। আবার কেউ উল্টো একই কনটেন্ট বারবার দেখতে থাকেন। কারও মধ্যে ভয়, উৎকণ্ঠা ও হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতাও বেড়ে যেতে পারে।

তাই নিজেকে একটু বিরতি দিন

সব খবর জানা জরুরি নয়। বিশেষ করে ঘুমানোর আগে ভয়াবহ ছবি ও ভিডিও দেখা থেকে বিরত থাকা ভালো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ধরনের কনটেন্ট বারবার এলে তা এড়িয়ে যাওয়া, প্রয়োজন হলে কিছু সময়ের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিরতি নেওয়া এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম থেকে সীমিত সময়ে খবর জানা যেতে পারে।

যদি দীর্ঘদিন ধরে ভয়, উৎকণ্ঠা, দুঃস্বপ্ন, ঘুমের সমস্যা বা দৈনন্দিন কাজে অস্বাভাবিক প্রভাব অনুভূত হয়, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ সব খবর জানা দায়িত্বশীলতার অংশ হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি ভয়াবহ দৃশ্য নিজের মনের ভেতর বহন করে চলা জরুরি নয়।

সূত্র: মিডিয়াম, এনডিটিভি, সাইকোলজি টুডে

এসএকেওয়াই

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *