‘গণপতি বিনয়ী ও মিষ্টভাষী মানুষ ছিলেন’
রংপুরে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী এবং ছেলে-মেয়ের হত্যার রহস্য উদঘাটনসহ অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন গণপতি চক্রবর্তীর স্কুলের সহকর্মী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও সন্তানদের স্মরণে আয়োজিত সভা ও প্রার্থনায় এ দাবি জানান তারা।
স্মরণসভায় স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী পিয়ম চক্রবর্তীর স্মৃতিচারণ করেন সহকর্মী ও সহপাঠীরা। এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে প্রিয় শিক্ষক ও তার পরিবারের হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন শিক্ষকেরা।
স্মরণসভায় প্রতিষ্ঠানটির সাবেক প্রধান শিক্ষক আবু রায়হান মিজানুর রহমান বলেন, শিক্ষক হিসেবে গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন বিনয়ী ও মিষ্টভাষী। গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি অবসরে যান। তাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের এমন মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড মেনে নিতে পারছেন না। জিলা স্কুল পরিবার এমন ঘটনায় শোকাহত ও মর্মাহত।
মিজানুর রহমান আরও বলেন, ‘‘গণপতি চক্রবর্তীর অবসরকালীন একটি ভাতা ব্যাংক থেকে উত্তোলনের কথা ছিল। বিষয়টি আমরা জানি না। তবে পুলিশকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। এছাড়াও এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা তদন্তে পরিষ্কার করতে হবে। আমরা এই হত্যার ন্যায়বিচার চাই।’’
গণপতি চক্রবর্তীর সহকর্মী ও স্কুলজীবনের বন্ধু অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শফিয়ার রহমান বলেন, ‘‘চারজন মানুষকে দুই যুবক হত্যা করেছে— বিষয়টি আমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। তাই এই হত্যাকাণ্ডের আরও সঠিক তদন্ত প্রয়োজন। শুনেছি, মামলার তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন করে ডিবিতে দেওয়া হয়েছে। আমরা পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা ও তদন্তকারী কর্মকর্তার ওপর আস্থা রাখতে চাই। তবে এই ঘটনা নিয়ে যে সন্দেহ রয়েছে, তা পরিষ্কার করার দাবি জানাচ্ছি।’’ অন্যথায় ন্যায়বিচারের দাবিতে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আবেগাপ্লুত হয়ে বক্তব্য দেন সাবেক শিক্ষার্থী ও গণপতির স্বজনরা।
নিহত গণপতির ভাতিজি-জামাই বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘আমার কাকাশ্বশুর একজন সৎ মানুষ ছিলেন। ছোট্ট পিয়ম আমার শ্যালক বাবুকে আমি খুব স্নেহ করতাম। এই হত্যাকাণ্ড আমরা মেনে নিতে পারছি না।’’ পুলিশের ওপর আস্থা রেখে ন্যায়বিচার দাবি করেন তিনি।
এছাড়াও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদমান, আকাশসহ ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন সাবেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী একই পরিবারের আলোচিত চার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানান।
সত্য আড়াল না করে গ্রেপ্তার দুই যুবক ছাড়াও আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান তারা। ঘটনা নিয়ে পুলিশের তদন্তে প্রশ্ন তুলে দ্রুত হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন বক্তারা।
বক্তারা বলেন, আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং জড়িত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা রংপুর মহানগর ডিবি পুলিশের ওসি জিনাত আলী বলেন, চার হত্যার ঘটনায় মরদেহ উদ্ধারের সময়সহ পুলিশের সঙ্গে গোয়েন্দা বিভাগের সব কর্মকাণ্ডে তিনি ছিলেন। সোমবার (২৪ আগস্ট) পুলিশের কাছ থেকে মামলার দায়িত্বভার তাকে দেওয়া হয়েছে। পূর্বের তদন্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে মামলার তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নতুন কোনো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেলে আগামীকালকের মধ্যে জানানো হবে বলেও জানান তিনি।
গত ২২ আগস্ট রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরীর মাসুয়া পাড়া এলাকায় তালাবদ্ধ একটি বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, স্নাতক সম্পন্ন করা মেয়ে ও প্রাথমিকের শিক্ষার্থী ছেলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরে নিহত গণপতির বড় ভাই গোপিনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামের দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রবিবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য নিশ্চিত করেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।
সেসময় তিনি জানান, গভীর রাতে গণপতির বাসার ছাদে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ ইয়াবা সেবন করছিলেন। তাদের বাধা দেওয়ায় বাসার মালিক গণপতিসহ তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েকে একে একে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
