বেতন বাড়বে ১০০-১৪২%, দেওয়া হবে চার ধাপে
বেতন-ভাতা ও পেনশনের হার বাড়িয়ে বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। মন্ত্রিসভা একই সঙ্গে অনুমোদন করেছে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি। বিচার বিভাগের জন্য আলাদা কাঠামো পরে আসবে। সব কার্যকর হবে গত ১ জুলাই থেকে।
সচিবালয়ে গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামোর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। গ্রেডভেদে মূল বেতন বাড়বে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। তবে এটি বাস্তবায়ন হবে দুই বছরের মধ্যে তিন ধাপে। বৈঠক শেষে অর্থ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে তা জানায়। পরে তথ্য অধিদপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
অনুমোদনের পটভূমি তুলে ধরে বলা হয়, জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার সুপারিশ প্রণয়নের জন্য একটি সচিব কমিটি গঠন করে। ওই সচিব কমিটির দাখিল করা প্রতিবেদন মন্ত্রিসভার বৈঠকে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক বেতনকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রিসভা নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করে বলে জানানো হয়।
বলা হয়, জাতীয় বেতনকাঠামো সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এখন প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনায় বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর বিস্তারিত বিধান থাকবে। সরকার মনে করছে, পুরো বেতনকাঠামো একবারের বদলে ধাপে ধাপে কার্যকর করা হলে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কম পড়বে।
নতুন কাঠামোতে আগের মতোই থাকছে ২০টি গ্রেড। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন হবে ৮ হাজার ২৫০ টাকার বদলে ২০ হাজার টাকা। আর সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের বেতন হবে নির্ধারিত ৭৮ হাজার টাকার বদলে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
তবে পুরো বেতনকাঠামো একসঙ্গে কার্যকর হবে না। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮—এই দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে দেওয়া হবে বেতন-ভাতা। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাতে ন্যায্যতা আনা হয়েছে। বর্তমানে এই অনুপাত ১: ১ দশমিক ৯৪৫। কমিয়ে করা হয়েছে ১: ১ দশমিক ৭৮। সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়বে।

১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থাৎ চলতি ২০২৬-২৭ ও আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থ বিভাগে যোগাযোগ করে জানা গেছে, গত ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের ৪০ শতাংশ, আগামী বছরের জানুয়ারিতে ৩০ শতাংশ এবং আগামী জুলাইয়ে দেওয়া হবে বাকি ৩০ শতাংশ। আর বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। অবসরভোগীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম থাকবে।
বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতনকাঠামো করা হবে। এ জন্য ইতিমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতনকাঠামো অনুমোদন করা হবে। সেটিও কার্যকর হবে একইভাবে ধাপে ধাপে।
কম পেনশনভোগীদের বেশি সুবিধা
নতুন বেতনকাঠামোয় পেনশনভোগীদের জন্য বড় ধরনের সুবিধা রাখা হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে সামরিক ও অসামরিক—উভয় ক্ষেত্রে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে বিএনপির।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ ব্যবস্থা সামরিক ও অসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই একই সঙ্গে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। কিন্তু এখনই ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ চালু করতে গেলে সরকারের ওপর বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি হবে। ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া অসামরিক কর্মচারী অনেকের তথ্য সরকারের কাছে নেই। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে। এর আগে এবারেরটি হচ্ছে বিকল্প ব্যবস্থা।
নতুন কাঠামোয় মাসে ৯ হাজার টাকা বা তার কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ৫৫ শতাংশ বাড়বে।
সবার জন্য মোবাইল ভাতা ও প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা
সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু করা হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য মাসে দেওয়া হবে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা।
এ ছাড়া ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগের ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে সব গ্রেডের জন্য রাখা হয়েছে মোবাইল ভাতা। এত দিন শুধু পঞ্চম গ্রেড থেকে ওপরের ধাপের সবার জন্য মোবাইল ভাতা প্রযোজ্য ছিল।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী উপকৃত হবেন। পাশাপাশি সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীও এর আওতায় আসবেন। সব মিলিয়ে সুবিধাভোগী হবেন ৩৩ লাখ মানুষ।
বলা হয়, নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে বছরে সরকারের বাড়তি খরচ হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। মধ্যমেয়াদি বাজেট–কাঠামো অনুযায়ী বাজেটে এ অর্থের সংস্থান রাখা আছে। নতুন বেতনকাঠামো সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আয় বাড়াতে হবে সরকারের
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করতে বাড়তি অর্থের জোগান দিতে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আদায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি ও ঘাটতি ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরকে এবার ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে ৪৫ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হয় ২০২১-২২ অর্থবছরে, যা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়। চলতি অর্থবছরে জুলাই মাসে কত রাজস্ব আদায় হয়েছে, সেই হিসাব চূড়ান্ত করেনি এনবিআর।
সরকারের আয় না বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো দীর্ঘদিন এনবিআরে বড় কোনো সংস্কার হয়নি। ফলে আয়ের জোগানে বড় উল্লম্ফন নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে বাড়তি অর্থের জোগানে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির বিকল্প নেই। সংস্কারের উদ্যোগ নিলে ফল পেতেও সময় লাগবে।
অন্তর্বর্তী সরকার এনবিআরের সংস্কার-উদ্যোগ নিলেও তা থমকে আছে। এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি বিভাগ করার কথা ছিল। অধ্যাদেশ হলেও বিএনপি সরকার তা পাস করেনি। পর্যালোচনা করতে গত ২৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে প্রধান করে কমিটি গঠিত হয়, তবে সেই কমিটি এখনো প্রতিবেদন দেয়নি।
এদিকে গত ২৩ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে এনবিআরের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একটি উপস্থাপনা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, উপজেলা পর্যন্ত করজাল বিস্তৃত করা হবে এবং কর ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করা হবে। ভ্যাট হার হবে একক। ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে, যা এখন ৭ শতাংশের একটু বেশি।
ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা রাখতে হবে
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা বাড়ানো হলে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন বাড়ানোর চাপ আসবে। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যে চাঙাভাব নেই। নতুন বিনিয়োগের দৃশ্যমান কোনো প্রতিফলন নেই। কর্মস্থানও কম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এই হার ২২ শতাংশের নিচে নেমেছে।
চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে নতুন বিনিয়োগে কতটা আকৃষ্ট হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এ সংকটের কারণে এমনিতেই উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে। পণ্য উৎপাদন বিঘ্নিত হলে রাজস্ব আদায়ও কম হবে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য শ্লথ আছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি না এলে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে না। তবে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যেন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা—এসব খাতে বরাদ্দ কাটছাঁট না হয়। আবার টাকা ছাপিয়ে যেন বেতনভাতা দেওয়া না হয়।
সেলিম রায়হানের মতে, বেসরকারি খাত চাপে আছে। নতুন বিনিয়োগ দৃশ্যমান নয়। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা না থাকলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা কিন্তু তাঁদের কর্মীদের বেতন বাড়াতে আগ্রহী হবেন না।
