ভার্চুয়াল জগৎ কেন তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করছে
বুশরা আজমী
কবে শেষবার মিষ্টি একটা সকাল দেখেছেন, মনে আছে? মনে নেই, তাই তো? আর কবে সকালের সতেজ বাতাসে চোখ বুজে দীর্ঘ একটা শ্বাস নিয়েছিলেন? ভেবে দেখুন, মনে থাকবেই বা কী করে! আমাদের সকাল এখন শুরু হয় ঘুমঘুম চোখে স্মার্ট ফোন খোঁজার মধ্য দিয়ে—নোটিফিকেশন এলো, কে মেসেজ দিলো, কে কমেন্ট করল, কী নতুন পোস্ট এসেছে—এসব দেখতেই কেটে যায় দিনের শুরুটা। একসময় মানুষ দিনের শুরু করত প্রকৃতির সঙ্গে, আর এখন অনেকের দিন শুরু হয় একটি স্ক্রিনের সঙ্গে।
আসক্তি সমাজের পুরোনো ও ভয়াবহ সমস্যা। একজন মানুষকে ধীরে ধীরে পরিবার, সমাজ ও স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ডিজিটাল যুগে ধ্বংসের এই আসক্তি যেন নতুন রূপ পেয়েছে—ইন্টারনেট আসক্তি। মাদকের মতোই ইন্টারনেটও যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়; তখন তা মানুষের সময়, মনোযোগ, সম্পর্ক ও স্বাভাবিক জীবনকে গ্রাস করতে শুরু করে। পার্থক্য শুধু এতটুকু—মাদকের নেশা লুকিয়ে রাখতে হয় আর ইন্টারনেটের নেশা অনেক সময় আমরা গর্বের সঙ্গেই প্রকাশ করি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ আমাদের জীবনের প্রয়োজনীয় অংশ। যোগাযোগ, শিক্ষা, সংবাদ, ব্যবসা, বিনোদন—সবকিছুতেই এর ভূমিকা আছে। কিন্তু প্রয়োজন আর আসক্তির মধ্যে পার্থক্য আছে। একাকিত্ব, হতাশা, সম্পর্কের ব্যর্থতা কিংবা নিজের অনুভূতি প্রকাশের জায়গা হিসেবে অনেকেই ভার্চুয়াল জগতকে বেছে নিচ্ছেন। সামান্য মতের অমিলেও শুরু হচ্ছে তর্ক, গালাগালি, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অযথা বিতর্ক। ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের মানুষ ও সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল পরিচয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে ইন্টারনেট শুধু সময় কেড়ে নিচ্ছে না, আচরণ ও মানসিকতার ওপরও প্রভাব ফেলছে।
ইন্টারনেট তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে; যখন এটি ব্যবহারের প্রয়োজনকে ছাড়িয়ে জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে। ইন্টারনেট ছাড়া থাকতে না পারা, ব্যবহার কমাতে গেলে অস্থিরতা বা দুশ্চিন্তা হওয়া, পড়াশোনা ও কাজের ক্ষতি হলেও ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া, পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে লুকিয়ে অতিরিক্ত সময় অনলাইনে থাকা—এসবই আসক্তির লক্ষণ হতে পারে। বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জীবন বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে শুরু করলে বুঝতে হবে, আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করছি না; বরং প্রযুক্তিই আমাদের ব্যবহার করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ঘুমের ব্যাঘাত, চোখে চাপ, মাথাব্যথা, ঘাড় ও কোমরব্যথাসহ নানা শারীরিক সমস্যা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই নেশার শুরু অনেক সময় শৈশবেই। সন্তান খাচ্ছে না, কান্না করছে কিংবা দুষ্টুমি করছে—তাকে শান্ত রাখতে ব্যস্ত বাবা-মা হাতে তুলে দিচ্ছেন স্মার্ট ফোন। কিছুক্ষণ পর শিশু চুপ হয়ে যাচ্ছে, তাই মনে হচ্ছে সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু সেই সাময়িক শান্তির আড়ালেই তৈরি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস। বাবা-মায়ের নিজেদের প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস এবং বিভিন্ন অনলাইন কনটেন্টও শিশুদের স্ক্রিনের প্রতি আরও আকৃষ্ট করে। ধীরে ধীরে ঘুম ও পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে, অনলাইনে সময় না পেলে বিরক্তি বাড়ে, খেলাধুলা ও পুরোনো শখের প্রতি আগ্রহ কমে যায়। এমনকি ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়েও মিথ্যা বলার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে তরুণ সমাজের ওপর। যে বয়সে স্বপ্ন দেখার কথা, দক্ষতা অর্জনের কথা, বইপড়ার কথা, মাঠে খেলাধুলা করার কথা কিংবা সমাজের জন্য কিছু করার কথা—সে বয়সের বড় একটি অংশ যদি স্ক্রিনের সামনে কেটে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। মাদক যেমন একজন তরুণের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করতে পারে, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট আসক্তিও তার সময়, মনোযোগ, সৃজনশীলতা ও বাস্তব জীবনের সম্পর্ককে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তবে প্রযুক্তিকে শত্রু বানিয়ে সমাধান পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন প্রযুক্তির সঠিক ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। সন্তানদের ইন্টারনেট থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বাবা-মা। শুধু মোবাইল কেড়ে নিলেই হবে না; তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, খেলতে হবে, সময় দিতে হবে, বাইরে ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে এবং বাস্তব জীবনের আনন্দের সঙ্গে তাদের পরিচিত করতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদেরও বুঝতে হবে—অনলাইনে থাকা আর জীবনে থাকা এক বিষয় নয়। নিজের জন্য নির্দিষ্ট স্ক্রিন টাইম, পড়াশোনা, ঘুম, খেলাধুলা ও পরিবার-বন্ধুদের জন্য সময় নিশ্চিত করতে হবে।
মাদক হোক কিংবা ইন্টারনেট—নেশার ধরন আলাদা হলেও ক্ষতির পথ অনেক সময় একই। দুটোই মানুষকে তার স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। তাই প্রশ্নটা শুধু ‘মাদক থেকে তরুণদের কীভাবে বাঁচাব?’ নয়; প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘কোন কোন নেশা নিঃশব্দে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে গ্রাস করছে?’ মাদক দৃশ্যমানভাবে জীবন নষ্ট করে, আর ইন্টারনেট আসক্তি অনেক সময় হাসতে হাসতেই জীবনের মূল্যবান সময় কেড়ে নেয়। তাই প্রযুক্তির যুগে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রযুক্তিকে ত্যাগ করা নয় বরং তার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেওয়া। কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে শুধু একটি স্মার্টফোন নয়—একটি সুস্থ, সুন্দর ও সম্ভাবনাময় জীবন তুলে দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব।
লেখক: সম্মান ৩য় বর্ষ, সমাজকর্ম বিভাগ, রাজশাহী কলেজ।
এসইউ
