রাজস্ব আয় বেড়েছে দ্বিগুণ, আমদানি-রপ্তানিও রমরমা


  • দেশের একমাত্র চতুর্দেশীয় স্থলবন্দর বাংলাবান্ধা
  • লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৯৪ কোটি টাকা রাজস্ব আয়
  • বন্দরে পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যা বেড়েছে

একসময় পাথর আমদানিনির্ভর বন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। ভুটান ও ভারত থেকে সীমিত পরিসরে পাথরবাহী ট্রাকের আসা-যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এই বন্দরের কার্যক্রম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন এই বন্দর দিয়ে পাথরের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, তৈরি পোশাক, প্লাস্টিক সামগ্রী, খাদ্যপণ্যসহ নানান ধরনের পণ্য আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে।

ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এই বন্দর। বর্তমানে বন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বৃদ্ধির সঙ্গে বেড়েছে সরকারের রাজস্ব আদায়।

বাংলাবান্ধা বন্দরের তথ্যমতে, গত অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরে আমদানি বেড়েছে এক লাখ ৩৫ হাজার ৬৫২ টন। আর রপ্তানি বেড়েছে ৫৬ হাজার ১৬৪ টনে। গত পাঁচ বছরে রাজস্ব আয় বেড়েছে অন্তত সাতগুণ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে রাজস্ব আদায় হয় ১৬৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৩০ কোটি ২৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে রেকর্ড ৪২৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ২৫৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

‘দেশের একমাত্র চতুর্দেশীয় স্থলবন্দর বাংলাবান্ধা দিয়ে ১৯৯৭ সালে নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমিত পরিসরে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু হয়। পরে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়। সবশেষ ২০১৭ সালে ভুটান থেকে পাথর আমদানির মধ্য দিয়ে চার দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের নতুন অধ্যায় শুরু হয়’

স্থলবন্দর ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দেশের একমাত্র চতুর্দেশীয় স্থলবন্দর বাংলাবান্ধা দিয়ে ১৯৯৭ সালে নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমিত পরিসরে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু হয়। পরে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়। সবশেষ ২০১৭ সালে ভুটান থেকে পাথর আমদানির মধ্য দিয়ে চার দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবস্থানগত কারণে এই বন্দর দিয়ে চতুর্দেশীয় স্থলপথে বাণিজ্য সম্প্রসারণের বড় সুযোগ রয়েছে। তবে সম্ভাবনাময় এই বন্দরের সক্ষমতা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য দ্রুত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানের বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাবান্ধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে কৃষি ও শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সহজে আমদানির সুযোগ থাকায় দেশের ব্যবসায়ীসহ শিল্পোদ্যোক্তারাও লাভবান হতে পারেন। এখানে আরও নতুন পণ্য আমদানি ও রপ্তানির অনুমোদন, আধুনিক গুদাম, পর্যাপ্ত ইয়ার্ড, দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং পণ্য লোড আনলোডের জন্য উন্নত প্রযুক্তি নিশ্চিত করা গেলে এ বন্দর দিয়ে বাণিজ্যের পরিমাণ কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব।

সম্প্রতি বন্দর ঘুরে দেখা যায়, বন্দরের আশপাশে এখন শুধু আমদানি করা পাথরের স্তূপ নয়; রপ্তানির অপেক্ষায় থাকা পাট ও বিভিন্ন পণ্যবোঝাই সারি সারি ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। আমদানি-রপ্তানিকারক, পরিবহন শ্রমিক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ব্যবসায়ীসহ বন্দরকে ঘিরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে।

আগে দীর্ঘদিন ধরে পাথর আমদানির মধ্যেই সীমিত পরিসরে চলছিল এই বন্দরের কার্যক্রম। বর্তমানে পাথরের পাশাপাশি গম, ভুট্টা, গমের ভুসি, প্লাস্টিক দানা, আদা, খৈল, চাল এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানি হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ভারত ও নেপালে রপ্তানি হচ্ছে আলু, পাট, পাটজাত পণ্য, কটন র‌্যাগস (ঝুট), প্লাস্টিক সামগ্রী, খাদ্যপণ্যসহ রপ্তানিযোগ্য নানান পণ্য। বিশেষ করে নেপালে আলু রপ্তানি বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক চিত্র বদলে দিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাবান্ধা দিয়ে নেপালে ১৯ হাজার ৭৪০ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে রপ্তানির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আলুর ভরা মৌসুমে নেপালে ৫০ হাজার টনের বেশি আলু রপ্তানি করা হয়। পাট, আলু ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের পাশাপাশি গার্মেন্টস ও প্লাস্টিক সামগ্রীর রপ্তানি বাড়ায় প্রতিদিন বন্দরে পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যাও বেড়েছে।

‘নেপালে আলু রপ্তানি বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক চিত্র বদলে দিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাবান্ধা দিয়ে নেপালে ১৯ হাজার ৭৪০ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে রপ্তানির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আলুর ভরা মৌসুমে নেপালে ৫০ হাজার টনের বেশি আলু রপ্তানি করা হয়’

আমদানি-রপ্তানিকারকসহ বন্দর সংশ্লিষ্টদের দাবি, এখানে ব্যবসায়িক সুযোগ সুবিধা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে কোল্ড চেইন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পচনশীল পণ্য দীর্ঘ সময় বন্দরে আটকে থাকলে ব্যবসায়ীদের লোকসানের ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে ভারতীয় অংশে পণ্য পরিবহন ও ট্রান্সশিপমেন্ট-সংক্রান্ত জটিলতা কমানো গেলে ব্যবসায়ীরা আরও বেশি আগ্রহী হবেন।

বাংলাবান্ধা এলাকায় ট্রাকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বন্দর এলাকায় প্রতিদিন যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে ইয়ার্ডে পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে সামনের সড়কে দাঁড়িয়ে থাকে পণ্যবাহী অসংখ্য ট্রাক।

ঢাকার একটি কোম্পানি থেকে আসা গাড়ির চালক শাহিন ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘আমি বাংলাদেশি ড্রাইভার। ভুসি নিয়ে আসছি। কয়েকদিন হয়ে গেল এখানে পড়ে আছি।’

সমস্যার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা গাড়ি নিয়ে ভারতের ওপারে যাই। সেখানে নেপাল থেকে গাড়ি এসে আমাদের পণ্য নিয়ে যায়। অনেক সময় তাদের গাড়ির অভাবে আমাদের ৮-১০ দিন আটকে থাকতে হয়। আমাদের এখানে থাকা-খাওয়ার তেমন কষ্ট নেই। তবে তাদের গাড়ি না আসায় আমরাও কোনো গাড়ি বের করতে পারি না।’

‘নানান কারণে কিছুদিন ভুটান ও বাংলাদেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি কিছুটা কমে গিয়েছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি অনেক সুন্দর ও অনুকূল হয়েছে। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে এখন আমদানি-রপ্তানির জন্য একটি ভালো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সরকার এ বিষয়ে সুদৃষ্টি দিলে ভবিষ্যতে আরও বেশি রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করা সম্ভব হবে’—ব্যবসায়ী নেতা

পণ্যবাহী আরেক ট্রাকচালক কুদরত উল্লাহ শান্ত জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘বন্দরে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বেড়ে যাওয়ায় অনেকের মতো আমরাও খুশি। তবে এখানে বেশ কিছু সমস্যা আছে। আমাদের স্থানীয় গাড়িগুলো সিরিয়াল অনুযায়ীই আসে। কিন্তু আমাদের পার্কিং পুরোপুরি ভরা থাকে, গাড়ি রাখার কোনো জায়গা নেই। অনেক সময় গাড়ি রাখতে হলে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। নেপালের গাড়িগুলো রাখার আলাদা জায়গা নেই। এসব গাড়ি সড়কে রাখা হয়। পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের অভাবে স্থানীয় পথচারীসহ আমাদের অনেকের সমস্যা হয়।’

স্থলবন্দরের আমদানি রপ্তানিকারক ও প্রধান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা মানিক প্রধান বলেন, ‘কিছুদিন ধরে আমাদের রপ্তানি বেড়েছে। আমদানি কিছুটা কম ছিল, তবে বর্তমানে আমদানিও বেড়েছে। বিশেষ করে নেপালে প্রচুর পরিমাণে রপ্তানি হচ্ছে। তবে আমাদের চা কারখানার জন্য আমদানি করা মেশিনারিজ ও পণ্য পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত ইয়ার্ড ও আধুনিক প্রযুক্তি না থাকায় লোড-আনলোডের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। এখানে আরও সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।’

বাংলাবান্ধা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ মামুন মুসা। বন্দরের বর্তমান কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর আগের তুলনায় এখন জমজমাট বলা যায়। এই বন্দরের মাধ্যমে আল্লাহর রহমতে আগের তুলনায় আমদানি-রপ্তানির সব কার্যক্রম বেড়েছে। এতে আমরা যারা স্টেকহোল্ডার আছি, বিশেষ করে যারা সিঅ্যান্ডএফ এবং আমদানি-রপ্তানির কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত, তারা উপকৃত হচ্ছি। এভাবে চললে একসঙ্গে এলাকাবাসীসহ বন্দর সংশ্লিষ্ট অনেকেই আমরা উপকৃত হবো।’

বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর আমদানি রপ্তানিকারক গ্রুপের আহ্বায়ক রেজাউল করিম শাহীন জানান, দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দর দিয়ে ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪০০ কোটি টাকারও বেশি। তার মতে, এই স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব আয় আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘নানান কারণে কিছুদিন ভুটান ও বাংলাদেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি কিছুটা কমে গিয়েছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি অনেক সুন্দর ও অনুকূল হয়েছে। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে এখন আমদানি-রপ্তানির জন্য একটি ভালো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সরকার এ বিষয়ে সুদৃষ্টি দিলে ভবিষ্যতে আরও বেশি রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।’

সার্বিক বিষয়ে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে ভুটান থেকে পাথর আমদানি হচ্ছে। ভারত থেকে পাথর আমদানি বেশ কিছুদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে আমদানির পরিমাণ কিছুটা কমে গেছে। তবে রপ্তানি এখন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন ৬৫-৭০টি ট্রাক পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য নেপাল ও ভারতে পাঠানো হয়। এভাবে যদি রপ্তানির প্রবণতা বজায় থাকে, ভারত ও ভুটান থেকে পাথর আমদানি স্বাভাবিক হয়, তাহলে বন্দরের কার্যক্রম ও ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে আমাদের রপ্তানি আরও বাড়বে।’

সমস্যার কথা জানিয়ে আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এখানে রপ্তানি খাতে আমরা কিছু সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। রপ্তানির গাড়িগুলো পণ্য আনলোড করার জন্য এখানে পর্যাপ্ত ট্রাক স্ট্যান্ড নেই। ফলে গাড়ি থেকে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে পণ্য আনলোড করতে হয়। আর সড়কে গাড়ি দাঁড়ানোর জন্য কিছুটা যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। আশা করি দ্রুত এই সমস্যারও সমাধান হয়ে যাবে।’

এসএইচএ/এসআর/এএসএম



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *