শিক্ষক থেকে রাষ্ট্রপতি


শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুরু, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, বিএনপির মহাসচিব হিসেবে এক দশকের বেশি সময় নেতৃত্ব দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবনে যুক্ত হলো নতুন অধ্যায়। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদে ভোটে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার খবরে দলটির তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দেখা দিয়েছে উচ্ছ্বাস।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

দলের নেতাকর্মীদের কাছে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া শুধু একজন দলীয় নেতার সাংবিধানিক পদে আসীন হওয়া নয়; বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি হিসেবেও দেখছেন তারা। বিশেষ করে, বিএনপির দুঃসময়ে দলের মহাসচিব হিসেবে তার ভূমিকা এবং গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলনে সক্রিয় অবস্থানকে সামনে আনছেন দলটির নেতাকর্মীরা।

ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল বলেছেন, “ব্যক্তিগতভাবে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং দেশের জনগণের পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।”

তিনি বলেন, “বিএনপির দুঃসময়ে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের পাশে থেকে মির্জা ফখরুল দীর্ঘদিন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছেন। শুধু মহাসচিব হিসেবে নয়, একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।”

রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও সাংবিধানিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে ভূমিকা রাখবেন বলে প্রত্যাশা করেন ছাত্রদলের এই নেতা।

আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে প্রিজন ভ্যানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক সাজিদ হাসান বাবু রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। এটি শুধু বিএনপির জন্য নয়, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি দলের দুঃসময়ে অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।”

তিনি বলেন, “শিক্ষকতা থেকে শুরু করে রাজনীতির দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজ তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তার সততা, অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনে কাজে আসবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। তিনি দলীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে সব নাগরিকের অধিকার, সংবিধান ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় ভূমিকা রাখবেন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার বিষয়টি তুলে ধরে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, “রাজনৈতিক সংগ্রাম ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে মির্জা ফখরুল এখন রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পর্যায় বঙ্গভবনে যাচ্ছেন। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি দেশ ও সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে আশা করি।”

মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে শুধু দলীয় উচ্ছ্বাস নয়, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিএনপির সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দলটির মনোনীত প্রার্থীর জয় অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল বলে মনে করেন দলটির নেতারা। একইসঙ্গে বিরোধী পক্ষ থেকে প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়াকে গণতান্ত্রিক চর্চার ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন তারা।

এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, “সংসদীয় ব্যবস্থায় সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি অনেকটাই অনুমেয় ছিল। তারপরও বিরোধী দল প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতির চর্চা হয়েছে।”

শিক্ষকতা থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়ার পথটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ও পেশাগত অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা মির্জা ফখরুল পরবর্তী সময়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে শেষ পর্যন্ত দলের মহাসচিবের দায়িত্বে আসেন তিনি।

রাজধানীর নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দলীয় সমাবেশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

বিএনপির দুঃসময়ে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা, রাজনৈতিক আন্দোলন এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনায় মির্জা ফখরুলকে নিয়মিতভাবে সামনে দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে দলের মুখপাত্র হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

এখন সেই রাজনৈতিক পরিচয় পেছনে রেখে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের পালা। দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা একজন নেতার জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা, সংবিধান রক্ষা এবং রাষ্ট্রের সব পক্ষের প্রতি সমান দায়িত্বশীলতার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পারিবারিকভাবেও রাজনীতির দীর্ঘ ঐতিহ্য

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে তার পারিবারিক ঐতিহ্যেরও গভীর যোগ রয়েছে। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ। ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচনি এলাকা থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ সরকারের কৃষিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমীন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজও ছিলেন বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদ। তিনি ভূমিমন্ত্রী, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী এবং দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি ঢাকার একটি নির্বাচনি এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

অন্য চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ সুবিধা তদারকির জন্য গঠিত যুব শিবির অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবেও তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

শিক্ষকতা ও গবেষণার ছাপ

রাজনীতির পাশাপাশি মির্জা ফখরুলের পারিবারিক জীবনে রয়েছে শিক্ষা ও গবেষণার যোগ। তার বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ঢাকার একটি স্বনামধন্য স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

শিক্ষকতা, রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা—তিনটি ভিন্ন পরিসরের অভিজ্ঞতা মির্জা ফখরুলের জীবনের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত হয়েছে।

তৃণমূলে প্রত্যাশা বেশি

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা একজন নেতাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দেখে দলটির নেতাকর্মীরা যেমন উচ্ছ্বসিত, তেমনই তার সামনে থাকা দায়িত্ব নিয়েও সচেতন তারা।

দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দায়িত্ব পালন করবেন, এমন প্রত্যাশাই এখন বিএনপির নেতাকর্মীদের। তাদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্বকে আরো কার্যকরভাবে পালন করতে পারবেন।

একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখা। বিএনপির নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও তাই এখন বঙ্গভবনকেন্দ্রিক। মির্জা ফখরুল তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কীভাবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে রূপ দেন, সেটিই হবে দেখার বিষয়।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক যাত্রা ক্ষমতার করিডর ধরে শুরু হয়নি। রাজনীতির অগ্নিপরীক্ষার মাঠ রাজপথেই তিনি বারবার প্রশ্ন করেছেন গণবিরোধী ক্ষমতাকে। রাজনৈতিক সচেতন পরিবারে বেড়ে ওঠার ফলে ছোটবেলা থেকেই ছিলেন মানুষ, সমাজ এবং রাজনীতির প্রতি আগ্রহী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা শেষে যোগ দেন শিক্ষকতা পেশায়। 

আশির দশকে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর ১৯৯২ সালে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব আর ২০১৬ সালে মহাসচিব নির্বাচিত হন।  

২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে হন কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী। ২০১৮ সালে নির্বাচিত হন বগুড়া-৬ আসন থেকে।

২০১৩ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান সমন্বয়ক ও সাংগঠনিক নির্দেশকের ভূমিকা পালন করেন। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির ঢাকা মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে মির্জা ফখরুলকে গ্রেপ্তার করে কয়েকটি মামলার আসামি করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। 

একাধারে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব এবং শক্ত হাতে দলীয় সংকট মোকাবিলা করে দেশের রাজনীতিতে এক অনন্য ব্যাক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন তিনি। রাজপথ থেকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মাইলফলক।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *