ধ্বংসের পথে কবি কাজী কাদের নেওয়াজের স্মৃতিধন্য বাড়ি
বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র কবি, শিক্ষাবিদ ও শিশুসাহিত্যিক কাজী কাদের নেওয়াজ। তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ আজও মানুষের মুখে মুখে। অথচ মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার মুজদিয়া গ্রামে এই গুণী কবির স্মৃতিধন্য বাড়িটি পড়ে আছে চরম অযত্ন-অবহেলায়। ইতিহাস ও সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি সংরক্ষণে দীর্ঘদিনেও কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সাহিত্যিক, শিক্ষক ও সচেতন মহল।
মাগুরা শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে শ্রীপুর উপজেলার মুজদিয়া গ্রামে কবি কাজী কাদের নেওয়াজের বাড়ি। বাড়ির পাশেই তাঁর সমাধি। জীবনের শেষ সময় তিনি এই গ্রামেই কাটিয়েছেন। এখান থেকেই সাহিত্যচর্চা করেছেন। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি আজও অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে। অথচ যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নিদর্শনটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, কবির বসতবাড়িটি এরই মধ্যে গেজেটভুক্ত হয়েছে। কিন্তু গেজেটভুক্তির পরও বাড়িটির যথাযথ সংরক্ষণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে গেজেটভুক্তির পরও যদি একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা অযত্নে পড়ে থাকে, তাহলে এর সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে আর কত সময় লাগবে?

স্থানীয়দের ভাষ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এমন ঐতিহাসিক নিদর্শন হারিয়ে গেলে শুধু একটি বাড়ি হারানো নয়; হারিয়ে যাবে একটি সময়, একটি সাহিত্যিক ঐতিহ্য এবং একজন গুণী মানুষের স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই কালক্ষেপণ না করে বাড়িটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে বাড়িটিকে সাহিত্য-সংস্কৃতির স্মৃতিকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলারও দাবি উঠেছে।
কাজী কাদের নেওয়াজ ১৯০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি মুর্শিদাবাদের তালেবপুরে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোটে। উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। দেশভাগের পর ঢাকায় এসে নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পরে দিনাজপুর জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক হন। ১৯৬৬ সালে অবসর নিয়ে মাগুরার শ্রীপুরের মুজদিয়া গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি নিজ গ্রামেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় বিচরণ থাকলেও কবিতাই ছিল তাঁর প্রধান চর্চার ক্ষেত্র। ‘মরাল’, ‘দাদুর বৈঠক’, ‘নীল কুমুদী’, ‘মণিদীপ’, ‘কালের হাওয়া’, ‘মরুচন্দ্রিকা’, ‘দুটি পাখি দুটি তারা’ ও ‘উতলা সন্ধ্যা’ তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেন। তাঁর ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতা এখনো নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষকের মর্যাদা ও আদর্শের প্রতীক হয়ে আছে।

মাগুরার ইতিহাস ও ঐতিহ্য গবেষক ডা. কাজী তাসুকুজ্জামান বলেন, ‘রবীন্দ্র-নজরুল যুগের কবি হয়েও কাজী কাদের নেওয়াজ নিজস্ব ভাষা, ছন্দ ও ভাবনায় বাংলা সাহিত্যে অনন্য স্থান তৈরি করেছেন। এমন একজন কবির স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।’
লেখক ও বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মুসাফির নজরুল বলেন, ‘কাজী কাদের নেওয়াজ শুধু একজন কবি নন, তিনি একজন আদর্শ শিক্ষকও ছিলেন। নতুন প্রজন্মের জন্য তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।’
প্রবীণ সাহিত্যিক ও গবেষক বিকাশ মজুমদার বলেন, ‘সাহিত্যের সব শাখায় কবির প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর ‘হারানো টুপি’ কবিতা প্রকাশের পর কবি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। এমন গুণী মানুষের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।’

স্থানীয় প্রবীণ শিক্ষক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘কাজী কাদের নেওয়াজের কবিতায় মাতৃভক্তি, গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা, শিশুদের প্রতি স্নেহ, দেশপ্রেম ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ফুটে উঠেছে। তাঁর স্মৃতি ধরে রাখা আমাদের দায়িত্ব।’
জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর (প্রোগ্রাম) কাজী মাজেদ নেওয়াজ বলেন, ‘সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ যদি বাড়িটি সংরক্ষণ বা অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেয়, তাহলে পরিবারের পক্ষ থেকে অবশ্যই সহযোগিতা করা হবে।’
মাগুরা শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অসীম কুমার রায় বলেন, ‘কাজী কাদের নেওয়াজ বাংলা সাহিত্যের একজন নক্ষত্র। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি অযত্নে পড়ে আছে। তাঁর মতো একজন গুণী কবির স্মৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।’

মাগুরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহবুবুল হক বলেন, ‘কবি কাজী কাদের নেওয়াজের বসতবাড়িটি গেজেটভুক্ত করা হয়েছে। আশা করি, বিষয়টির দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে।’
এমএমআইজে/এসইউ
