আইফোনের কিস্তি বিরোধে পরিবারের ৩ জনের মৃত্যু ‘সম্পূর্ণ গুজব’
ভারতের মহারাষ্ট্রে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণের আইফোন কেনার কিস্তি পরিশোধ করতে না পারাকে কেন্দ্র করে বাবা-মায়ের সঙ্গে কলহ এবং তার জেরে পাহাড় থেকে লাফিয়ে একই পরিবারের তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যুর যে খবর ছড়িয়েছে, তাকে সম্পূর্ণ ‘গুজব’ বলে দাবি করেছেন নিহতের পরিবার।
গত ২১ আগস্ট মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে ঘটে যাওয়া এই হৃদয়বিদারক ঘটনার নেপথ্যে শুধু আইফোনের কিস্তি পরিশোদের বিষয়টি মূল কারণ ছিল না বলে জানিয়েছে পুলিশ ও নিহতের স্বজনরা।
প্রাথমিক খবরে বলা হয়েছিল, ১৮ বছরের তরুণ কুণাল চান্দগুড়ে আইফোনের কিস্তি মেটাতে না পেরে বাবা-মায়ের কাছে টাকা চান। এ নিয়ে বিবাদের এক পর্যায়ে কুণাল পাহাড়ে উঠে আত্মহত্যার হুমকি দেন। তাকে নিচে নামিয়ে আনার চেষ্টাকালে বাবা মুরলীধর চান্দগুড়েসহ কুণাল ২৫০ ফুট গভীর খাদে পড়ে যান। আর চোখের সামনে স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা মা সঙ্গীতা চান্দগুড়েও পাহাড় থেকে লাফ দেন।
তবে এই খবরকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন কুণালের খালা ও সঙ্গীতার বোন পল্লবী পাটিল। তিনি অভিযোগ করেন, তারা এই কথা ছড়াচ্ছেন তারা প্রকৃত সত্য সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগ্নের চিতাভস্ম সংগ্রহ করে বাড়ি ফেরার পথে এক আবেগঘন ভিডিও বার্তায় পল্লবী বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গল্পগুলো সম্পূর্ণ ভুয়া। যারা এসব ছড়াচ্ছেন, তারা আসল সত্যের কিছুই জানেন না। আমাদের এই অপূরণীয় ক্ষতির দিনে এমন মিথ্যা রটনা পরিবারকে চরম মানসিক কষ্টে ফেলছে।” ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ মা-বাবার কথা বিবেচনা করে এসব বিভ্রান্তিকর ভিডিও না ছড়ানোর অনুরোধ জানান তিনি।
সঙ্গীতার বোন পল্লবী পাটিল (বাঁ দিকে)। ছবি: এনডিটিভি
পুরোনো পারিবারিক কলহ কি মূল কারণ?
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, পেশায় ট্রাকচালক মুরলীধর ও গৃহিণী সঙ্গীতা দম্পতির বড় ছেলে ৬ বছর আগে অসুস্থতায় মারা যান। এরপর থেকেই পরিবারটিতে অশান্তি শুরু হয় এবং এক পর্যায়ে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকতে শুরু করেন। কাজের তাগিদে মুরলীধর মাসের পর মাস বাড়ির বাইরে থাকতেন। দীর্ঘদিন পর ঘটনার দুদিন আগে তিনি বাড়ি ফিরলে নতুন করে দাম্পত্য কলহ শুরু হয়।
তদন্ত চলাকালে পুলিশ সঙ্গীতার একটি পুরোনো ভিডিও উদ্ধার করেছে, যা পারিবারিক বিবাদের দিকেই ইঙ্গিত করে। ভিডিওতে নাম না প্রকাশ করে সঙ্গীতাকে বলতে শোনা যায়, “সম্পত্তির লোভে তুমি আমাকে ও আমার ছেলেকে প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছ। ভাইদের এক হতে দাওনি, সন্তানকে মা-বাবার থেকে আলাদা করেছ। আমার সুখের সংসার তুমি বিষিয়ে তুলেছ।”
নজরদারিতে সঙ্গীতার ইউটিউব চ্যানেল
নিহত সঙ্গীতা চান্দগুড়ে একজন সক্রিয় ইউটিউবার ছিলেন এবং তার চ্যানেলে প্রায় ২৯ হাজার সাবস্ক্রাইবার ছিল। মৃত্যুর ঠিক একদিন আগেও তিনি সম্পর্ক ও আত্মসম্মান নিয়ে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। মারাঠি ভাষায় ধারণ করা সেই ভিডিওতে তিনি বলেছিলেন, “সম্পর্ক রুটির মতো, দুপাশ থেকেই সমানভাবে সেঁকতে হয়। যেখানে পারস্পরিক মূল্য নেই, সেখানে থাকার চেয়ে বেরিয়ে আসাই ভালো।”
পুলিশের তথ্যমতে, কুণাল চান্দগুড়ে গত বছরও ঠিক একই পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। সে সময় পুলিশ তাকে বুঝিয়ে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলেও এবার শেষ রক্ষা হলো না।
পুরো ঘটনার নেপথ্যে কোনো প্ররোচনা বা সম্পত্তিগত বিরোধ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে জোর তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় পুলিশ।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি
