বড়পর্দায় কেমন হলো ‘মির্জাপুর’
২০১৮ সালে ওটিটিতে যাত্রা শুরু করে দর্শকের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল ‘মির্জাপুর’। একের পর এক সিজনে কালীন ভাইয়া, গুড্ডু পন্ডিত, মুন্না ভাইয়াদের ঘিরে তৈরি হয়েছিল আলাদা এক উন্মাদনা। তবে তৃতীয় সিজনে এসে সেই উত্তেজনায় কিছুটা ভাটা পড়েছিল। অনেকেরই মনে হয়েছিল, ‘মির্জাপুর’-এর গল্পে হয়তো আর নতুন করে চমকে দেওয়ার মতো কিছু নেই।
কিন্তু ‘মির্জাপুর: দ্য মুভি’ যেন সেই ধারণাকেই ভুল প্রমাণ করল।
তিন ঘণ্টারও বেশি সময়ের এই সিনেমা ফিরিয়ে এনেছে পুরনো ‘মির্জাপুর’-এর চেনা মেজাজ। ক্ষমতা দখলের লড়াই, প্রতিশোধ, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, কালীন ভাইয়ার ‘ভাওকাল’, গুড্ডু পন্ডিতের উন্মাদনা—সব মিলিয়ে বড়পর্দায় আবারও জমে উঠেছে মির্জাপুরের সেই অন্ধকার দুনিয়া। সঙ্গে নতুন সংযোজন হিসেবে রয়েছেন রবি কিষাণ।
সিরিজের সঙ্গে যোগসূত্র, গল্পে নতুন বাঁক
‘মির্জাপুর: দ্য মুভি’-র সঙ্গে ওয়েব সিরিজের একটি মৌলিক যোগসূত্র রয়েছে। পরিচিত চরিত্রগুলোও ফিরে এসেছে। তবে সিরিজের গল্পকে হুবহু বড়পর্দায় নিয়ে আসা হয়নি। বরং সিনেমার গল্প বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আলাদা। মাঝেমধ্যে সিরিজের পরিচিত কিছু দৃশ্য বা ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত অবশ্যই রয়েছে। আর সেই মুহূর্তগুলোই দর্শকের মনে ফিরিয়ে আনে ওটিটির পুরনো ‘মির্জাপুর’-এর নস্টালজিয়া। ফলে সিনেমার আবহ আরও পরিচিত ও উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।
পঙ্কজ ত্রিপাঠির প্রত্যাবর্তনেই যেন প্রাণ ফিরেছে
‘মির্জাপুর’-এর তৃতীয় সিজনের অন্যতম বড় আক্ষেপ ছিল কালীন ভাইয়ার চরিত্রে পঙ্কজ ত্রিপাঠির সীমিত উপস্থিতি। বড়পর্দার সিনেমা সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করেছে। কালীন ভাইয়ার উপস্থিতি, তাঁর হিসেবি চাল, ক্ষমতার দাপট এবং সিংহাসন ধরে রাখার লড়াই—সবকিছুই আবার সামনে এসেছে। পরিচালক গুরমিত সিং এবং লেখক পুনীত কৃষ্ণ, প্রযোজক ফারহান আখতারের তত্ত্বাবধানে, পুরনো চরিত্রগুলোর সঙ্গে নতুন সংযোজন মিলিয়ে তৈরি করেছেন বেশ জমজমাট এক সিনেম্যাটিক প্যাকেজ।
গুড্ডু পন্ডিত হিসেবে আলি ফজল—সবচেয়ে বড় চমক?
ছবির কেন্দ্রীয় লড়াই অবশ্য সেই পুরনো—মির্জাপুরের গদি কার দখলে থাকবে?
একদিকে নিজের বাবার স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য মরিয়া মুন্না ভাইয়া। অন্যদিকে উকিল বাবার আপত্তি অগ্রাহ্য করে গ্যাংস্টারের দুনিয়ায় জড়িয়ে পড়া গুড্ডু পন্ডিত ও বাবলু। বাবলু পন্ডিতের চরিত্রে বিক্রান্ত ম্যাসির পরিবর্তে এবার জিতেন্দ্র কুমারকে দেখা গেছে। শুরু থেকেই নিজের স্বাভাবিক অভিনয়ের ছন্দে চরিত্রটি ধরে রেখেছেন তিনি। তাঁর সংলাপ বলার ধরনও বেশ উপভোগ্য।
তবে সবচেয়ে বড় চমক সম্ভবত আলি ফজল।
গুড্ডু পন্ডিত চরিত্রে তিনি যে মাত্রার উন্মাদনা, কমেডি, হিংস্রতা ও অ্যাকশন দেখিয়েছেন, তা সিনেমার অন্যতম আকর্ষণ। চরিত্রটির ছেলেমানুষি থেকে ভয়ংকর রূপান্তর—প্রতিটি স্তরেই আলি ফজলকে বেশ সাবলীল মনে হয়েছে। বিশেষ করে শরীরচর্চায় মগ্ন গুড্ডুর একটি অদ্ভুত দৃশ্য প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের হাসি ও হাততালি কুড়িয়েছে। এখানেই বোঝা যায়, বড়পর্দায় ‘গুড্ডু পন্ডিত’-এর চরিত্রটি কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

রবি কিষাণের ‘বাব্বন’ নতুন উত্তেজনা
পুরনো দ্বন্দ্বের মধ্যে নতুন অনুঘটক হিসেবে হাজির হয়েছেন রবি কিষাণ। ‘বাব্বন যাদব’ চরিত্রে তিনি সিনেমার অন্যতম প্রধান খলনায়ক। ধূসর কিংবা নেতিবাচক চরিত্রে নিজের অভিনয়ের দক্ষতা বহু আগেই প্রমাণ করেছেন রবি কিষাণ। এবার ‘বাব্বন’ চরিত্রে তাঁর ঠান্ডা মাথার ভয়ংকর উপস্থিতি সিনেমায় আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
‘লাপতা লেডিজ’-এর পর রবি কিষাণকে এমন ভিন্ন মেজাজের চরিত্রে দেখে দর্শকের আগ্রহ আরও বাড়বে বলেই মনে হয়।
নারী চরিত্রের পরিসর কিছুটা কম
তিন ঘণ্টারও বেশি সময়ের সিনেমা হলেও নারী চরিত্রগুলোর জায়গা তুলনামূলকভাবে সীমিত। রাজনৈতিক চাল, ক্ষমতার লড়াই এবং বন্দুকের সংঘর্ষের মধ্যেই রসিকা দুগ্গল ও শেবা চাড্ডা নিজেদের দৃশ্যে নজর কেড়েছেন। বিশেষ করে শেবা চাড্ডার কয়েকটি সংলাপ ও দৃশ্য দর্শকের মধ্যে হাসি ও হাততালি তৈরি করেছে। সীমিত স্ক্রিনটাইমেও চরিত্রগুলো নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে পেরেছে।
মশলা ছবির ছাপ, তবে ‘মির্জাপুর’-এর হিংস্রতা অক্ষুণ্ণ
বলিউডের প্রচলিত মশলা সিনেমার ফর্মুলার প্রভাব এই ছবিতেও রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি আইটেম গান গল্পের গতির তুলনায় কিছুটা অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। তবে সেগুলো বাদ দিলে সিনেমার মূল গল্প বেশ দ্রুতগতিতেই এগিয়েছে।
আগের তুলনায় গালিগালাজ ও ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে কিছুটা সংযম দেখা গেলেও ‘মির্জাপুর’-এর নিজস্ব হিংস্রতা এবং অন্ধকার আবহ পুরোপুরি অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। অতিরিক্ত রক্তাক্ত দৃশ্যের বদলে টানটান উত্তেজনা তৈরির দিকেই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। আর এই সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর আলাদা করে প্রশংসার দাবি রাখে। অনেক সময় মনে হয়েছে, আবহসংগীতটিও যেন গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় কোথায় ‘মির্জাপুর: দ্য মুভি’?
সব মিলিয়ে সিনেমাটি মূলত তিনটি শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে—পঙ্কজ ত্রিপাঠির কালীন ভাইয়া, আলি ফজলের গুড্ডু পন্ডিত এবং দিব্যেন্দুর মুন্না ভাইয়া। এর সঙ্গে রবি কিষাণের ‘বাব্বন যাদব’ চরিত্র যোগ করেছে নতুন মাত্রা। অ্যাকশন তো রয়েছেই। তবে শুধুই অ্যাকশননির্ভর সিনেমা নয় এটি। গল্পের মধ্যে রয়েছে প্রেম, সম্মান আদায়ের চেষ্টা, ক্ষমতার লোভ এবং সেই ক্ষমতার জন্য বিশ্বাসঘাতকতা। আর এখানেই সিনেমাটি শুধুমাত্র ‘মির্জাপুর’ সিরিজের ভক্তদের জন্য নয়, বরং বড়পর্দার মশলা ও ক্রাইম-ড্রামা পছন্দ করা দর্শকদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
সিনেমার ক্লাইম্যাক্সে একটি বিষয় বেশ স্পষ্ট—মির্জাপুরের ক্ষমতার লড়াই এখনও শেষ হয়নি।
বরং শেষ দৃশ্যই যেন পরবর্তী অধ্যায়ের দরজা খুলে দেয়। ফলে ‘মির্জাপুর: দ্য মুভি’-র দ্বিতীয় পর্ব আসার সম্ভাবনা নিয়ে দর্শকের কৌতূহল তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। এখন আসল চ্যালেঞ্জ নির্মাতাদের জন্য—ওটিটির ‘মির্জাপুর’ এবং বড়পর্দার ‘মির্জাপুর’-এর আলাদা গল্পকে ভবিষ্যতে কতটা দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
কারণ মির্জাপুরের গদি নিয়ে খেলা যে এখনও শেষ হয়নি, সিনেমার শেষটুকু তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত।
বাপ্পি/সা.এ
