ডিএসইতে নিয়োগে ঘুসের অভিযোগ, ৫০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের মামলার হুমকি
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) পিএলসির দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুস ও নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ তুলে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির চাকরিচ্যুত এক নারীকর্মীকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
নোটিশে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন, বক্তব্য প্রত্যাহার, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা ও ভবিষ্যতে এ ধরনের বক্তব্য না দেওয়ার অঙ্গীকার চাওয়া হয়েছে। অন্যথায় মানহানির মামলা ও অন্তত ৫০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে দেওয়ানি মামলা করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ডিএসইর জেনারেল ম্যানেজার (এইচআর ও অ্যাডমিন) হাসান তারেক চৌধুরী এবং জেনারেল ম্যানেজার ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের প্রধান তাজুল ইসলামের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ওমর এইচ খান এ আইনি নোটিশ দিয়েছেন।
নোটিশটি ডিএসইর সাবেক এক্সিকিউটিভ মারিয়াম আক্তারের কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়, ১ আগস্ট ডিবিসি ২৪/৭ নিউজের একটি সংবাদ প্রতিবেদনে অংশ নিয়ে তিনি ডিএসইর ওই দুই কর্মকর্তার নিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গুরুতর, মিথ্যা ও মানহানিকর বক্তব্য দিয়েছেন। পরে ওই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।
আইনি নোটিশে দাবি করা হয়, সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিবেদনে এমন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, যার অর্থ দাঁড়ায়- ডিএসইর জেনারেল ম্যানেজার (এইচআর ও অ্যাডমিন) এবং জেনারেল ম্যানেজার (অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ) তাদের পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য ডিএসইর পরিচালক সৈয়দা জাকেরিন বখত নাসিরকে ৩০ লাখ টাকা ঘুস দিয়েছেন। কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে এ ধরনের লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া নোটিশে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চলে যাওয়ার পর ওই দুই কর্মকর্তা তাদের পছন্দের লোকজনকে নিয়োগ করবেন এবং অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার জন্য কিছু ব্যক্তিকে আগে থেকেই বাছাই করে রাখা হয়েছে, এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।
নোটিশে এসব অভিযোগকে নিছক মতামত বা সমালোচনা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, এসব বক্তব্যের মাধ্যমে ওই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুস প্রদান, দুর্নীতি বা বেআইনি আর্থিক লেনদেনে অংশগ্রহণ, পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার, ডিএসইর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ এবং অর্থের বিনিময়ে পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে নোটিশে ডিএসইর দুই কর্মকর্তা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, কোনো যাচাই-বাছাই, নথিপত্র বা যথাযথ ভিত্তি ছাড়াই এসব বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।
নোটিশে ডিএসইর নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কেও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ডিএসই একটি নিয়ন্ত্রিত ও স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে প্রায় ৩০৭টি ট্রেক হোল্ডার কোম্পানি, ৩৬০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানি এবং প্রায় ১৭ লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারী সম্পৃক্ত। জেনারেল ম্যানেজার ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটি (এনআরসি) সুপারিশ করে এবং ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ তা অনুমোদন করে।
আইনি নোটিশে আরও বলা হয়, প্রকাশ্যে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বক্তব্য প্রচারের ফলে ডিএসইর দুই কর্মকর্তার সুনাম, পেশাগত মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নোটিশে এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৯৯ ধারার আওতায় প্রাথমিকভাবে মানহানি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই আইনের ৫০০ ধারায় মানহানির শাস্তির বিধান রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
৭ দিনের সময়সীমা
অভিযোগের সত্যতা থাকলে তার পক্ষে প্রমাণ দেওয়ার জন্য চাকরিচ্যুত এই নারীকে সাতদিনের সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কথিত ৩০ লাখ টাকা প্রদানের তারিখ, সময় ও স্থান, কার কাছে অর্থ দেওয়া হয়েছিল, এ বিষয়ে ব্যাংকিং বা অন্য কোনো নথি, অডিও-ভিডিও বা ইলেকট্রনিক প্রমাণ এবং অর্থ প্রদানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়োগের সম্পর্কের প্রমাণ দিতে বলা হয়েছে।
এছাড়া অর্থের বিনিময়ে যেসব ব্যক্তিকে নিয়োগের জন্য আগে থেকেই বাছাই করে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে, তাদের পরিচয় ও এ-সংক্রান্ত প্রমাণও দিতে বলা হয়েছে।
একই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ভিডিও, পোস্ট, রিল ও বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মুছে ফেলা, ডিএসইর দুই কর্মকর্তার কাছে পৃথকভাবে লিখিত ও নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া এবং অভিযোগ প্রত্যাহার করার দাবি জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি অন্তত একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় নিজের খরচে প্রকাশ্য ক্ষমা ও বক্তব্য প্রত্যাহারের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং যেসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে, সেখানেও একই ধরনের বক্তব্য প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।
নোটিশে ভবিষ্যতে ওই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পুনরায় প্রকাশ, প্রচার, সম্প্রচার বা শেয়ার না করার বিষয়ে লিখিত অঙ্গীকারনামাও চাওয়া হয়েছে।
মানহানির মামলা ও ৫০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের হুঁশিয়ারি
আইনি নোটিশে বলা হয়, সাতদিনের মধ্যে এসব দাবি পূরণ করা না হলে ডিএসইর দুই কর্মকর্তা আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন। এর মধ্যে দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারায় ফৌজদারি মামলা এবং সুনামহানি ও অন্যান্য ক্ষতির জন্য দেওয়ানি মামলা করার কথা বলা হয়েছে।
এক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ হিসেবে অন্তত ৫০ কোটি টাকা দাবি করা হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে মামলা পরিচালনার আইনজীবী ফি, আদালত খরচসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয়ও অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে আদায়ের কথা জানানো হয়।
নোটিশে অবশ্য বলা হয়, প্রকৃত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো আইনসম্মত সমালোচনা, অভিযোগ কিংবা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে সদ্ভাবনাপূর্ণ অভিযোগ জানানোর বিষয়ে ডিএসইর কর্মকর্তাদের আপত্তি নেই। আপত্তি হলো- কোনো আইনগত বা তথ্যগত ভিত্তি ছাড়া প্রকাশ্যে ঘুষ, দুর্নীতি ও নিয়োগসংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগ প্রচার করা।
এমএএস/একিউএফ
